সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যকান্ড : এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল রিয়াদ ও যুক্তরাষ্ট্র

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : সাংবাদিক জামাল খাসোগি ছিল সৌদী সরকারের নির্মম প্রতিহিংসার শিকার। তুরস্কের বলিষ্ট পদক্ষেপে রিয়াদ অবশেষে হত্যাকান্ডের পূরো দায় দায়িত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি কিভাবে এবং কোথায় খাসোগিকে হত্যা এবং দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে দেয় – সেটাও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, হত্যার পূর্বে খাসোগির সাথে সৌদী যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের টেলিফোনে আলাপ হয়েছে। ইতিপূর্বে নির্বাসনে থেকে দুইজন সৌদী প্রিন্স রহস্যজনকভাবে নিহত হয়। এছাড়া নির্বাসিত অন্তত চারজন প্রিন্স তাদের ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কের কথা মিডিয়াকে জানিয়েছে। বিদেশের মাটিতে ভিন্ন মতালম্বীদের হত্যা নতুন কিছু নয়।তবে উপসাগরীয় রাজনীতিতে এটা নতুন মাত্রা যোগ হল।জামাল খাসোগি হত্যাকান্ডের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান প্রতিমূহুর্তে ব্যারোমিটারের ন্যায় উঠানামা রহস্য সৃষ্টি করছে।কখনো সৌদী সরকারের পক্ষে আবার কখনো বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে । খাসোগি হত্যাকান্ডের প্রথম থেকে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের আচরণে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।

সৌদী রাজতন্ত্রের কড়া সমালোচক জামাল খাসোগি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে আসছে।বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি সৌদী সরকারের সমালোচনা করতেন।আঙ্কারাস্থ সৌদী দূতাবাসে যান নিজের কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে। এরপর থেকে জামাল খাসেগি নিখোঁজ।প্রথম দিকে সৌদী সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে।কিন্তু তুরস্কের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পরাভূত হন সৌদী সরকার। এক এক করে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ইতিমধ্যে তুর্কি গোয়েন্দাদের হাতে হত্যার ভিডিও চিত্র এসে যায়।এক্ষেত্রে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ছিল নাছোড়বান্দা। জামাল খাসোগির হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে তিনি ছিলেন একাট্রা । তুরস্কের মাটিতে জামাল খাসোগি হত্যাকান্ড কেন্দ্র করে তুরস্কের বিরুদ্ধে সৌদী আরব – যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সূ-গভীর চক্রান্ত সম্পর্কে এরদোগান গোয়েন্দা সূত্রে পূর্বেই অবহিত ছিল। তাই সময় ক্ষেপন না করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ছিল এরদোগানের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় রিয়াদ – ওয়াশিংটন তুরস্কেকে হত্যাকারি দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করত।

জামাল খাসোগি হত্যাকান্ডে তুরস্ককে বেছে নেয়া হয় কেন ? এক্ষেত্রে রিয়াদ ও ওয়াশিংটন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল। বিষয়টি পরিস্কার করছি : ২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যূল্থান পরিচালিত হয় সিআইএর নীল নকসা মোতাবেক। ওয়াশিংটন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের উপর কখনো সন্তুষ্ট ছিলনা। তাই ২০১৬ সালে সংঘঠিত অভ্যূল্থানে সুবিধা করতে পারেনি। ইতিমধ্যে এরদোগান ওয়াশিংটন বিরোধী অবস্থানে চলে যান । এতদ্বঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ বিরোধী অবস্থানে দেখা যায় এরদোগানকে। মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের উপস্থিতি, রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নযন, এস-৪০০ ক্রয়। ইরানের সাথে সৌহাদ্যপূর্ণ অবস্থান, আইএস ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার সাথে ঐক্যমত, চীনের সাথে সহাবস্থান, ইসরাইল ও মিশরের স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান,গাজা উপত্যাকায় হামাস সংগঠনকে মানবিক সমর্থন এবং ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে এরদোগানের খোলাখুলি সমালোচনা, ন্যাটো সামরিক জোট ত্যাগের হুমকি, তুরস্কে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতি বর্জন ইত্যাদির কারনে ওয়াশিংটন এরদোগানের উপর ভীষন ক্ষুব্দ ছিল।

সৌদী আরব এরদোগানের উপর ক্ষিপ্ত কেন ? গত এক দশক তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান গোটা মুসলিম জাহানের স্বার্থে কথা বলেছে। যেখানে মুসলিম জাতি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, সেখানে এরদোগোনের সরব উপস্থিতি লক্ষনীয়। এতে করে এরদোগান মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে আর্বিভূত হচ্ছে। অপর দিকে সৌদী ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার লক্ষে প্রস্তুত হচ্ছে। সে সময় এরদোগানের উপস্থিতি সৌদী যুবরাজকে ক্ষুব্দ করে তোলে। সৌদী আরব পাশ্ববর্তী ক্ষুদ্র দেশ কাতার দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু এরদোগান কাতারকে সর্বাত্নক সমর্থন এমনকি সে দেশে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। এতে করে রিয়াদের নীল নকসা ভন্ডুল হয়। সৌদী আরবের প্রধান শত্রু হচ্ছে ইরান। তুরস্কের সাথে ইরানের সূ-সম্পর্ক হজম করতে পারছেনা রিয়াদ। মিশরের গনতান্ত্রিক সরকার হটিয়ে স্বৈরাচার জেনারেল সিসি’কে ক্ষমতায় বসায় সৌদী সরকার। তুরস্ক প্রথম থেকে মিশরের স্বৈরাচার সরকারের বিরোধিতা করে আসছে। রিয়াদ বিষয়টি সহজে গ্রহন করতে পারেনি।

আইএস ইস্যুতে তুরস্ক পিছু হটে । এতে করে রিয়াদ – ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়। সবকিছু মিলিয়ে এরদোগানকে টার্গেট করে তুরস্কের মাটিতে জামাল খাসোগি হত্যাকান্ড পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়। জামাল খাসোগি হত্যাকান্ডে ওয়াশিংটনের হাত রয়েছে। কারন সৌদী গোয়েন্দা সংস্থা বিদেশের মাটিতে হত্যাকান্ড পরিচালনা করার যোগ্যতা এখনো অর্জন করেনি। হত্যাকান্ডে মিশন সৌদী আরব ও মিশর থেকে পরিচালিত হয়েছে। একই দিন একই সময় রিয়াদ ও কায়রো থেকে দু’টি বিমানে করে ১৫ জন ঘাতক তুরস্কে অবতরন করে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যা মিশনে যাবার পূর্বে ১৫ সদস্যের কিলিং মিশনকে সিআইএ দিক নির্দেশনা দিয়েছে। জামাল খাসোগি প্রকৃত হত্যাকান্ড উদঘাটন করে তুরস্ক এ যাত্রায় রক্ষা পেল। কেননা, হতাকান্ড প্রমাণে ব্যর্থ হলে রিয়াদ – ওয়াশিংটন ঘটনাটি তুরস্কের উপর চাপিয়ে দিত। তখন হাড়গোড় বিহীন জাতিসংঘকে ব্যবহার করে তুরস্কের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা অবরোধ আরোপ করা হত। এতে করে তুরস্কের এরদোগানের অবস্থান নড়বড়ে এমনকি আরো একটি অভ্যূল্থানের আশংকা ছিল। কিন্তু ব্যর্থ শ্রম, রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের এক ঢিলে দুই পাখি মারার স্বপ্ন ভেস্তে গেল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

 

Facebook Comments