শি জিনপিং ও ভ্লামিদির পুতিন : ওয়াশিংটনের কপালে ভাঁজ

শি জিনপিং ও ভ্লামিদির পুতিন : ওয়াশিংটনের কপালে ভাঁজ

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : গতকাল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও দেশটির নীতি নিধারকদের উপস্থিতিতে চীনের আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মি. শি জিনপিং শপথ গ্রহন করেন । অপরদিকে আজ (রবিবার) রুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে । সর্বশেষ জরীপে জানা গেছে, ভ্লামিদির পুতিন বিপূল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে চলছে । রুশ ও পাশ্চাত্য বিভিন্ন জরীপে দেখা গেছে, রুশরা পুতিনের উপর আস্থাশীল । বিশেষ করে পুতিন বিশ্ব মানচিত্রে রাশিয়াকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে উন্নীতকরন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক অবস্থান সূ-সংহতকরনের সূবাদে ৭৫% রুশ ভোটার পুতিনের নেতৃত্ব পছন্দ করেন । সে সূবাদে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মি. পুতিন বিপূল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতে যাচ্ছেন । চীনের মি. শি জিনপিং ও রাশিয়ার মি. পুতিনের পূণ:উল্থান হোয়াইট হাইজের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ।




রুশ – মার্কিন কিংবা চীন – মার্কিন সম্পর্ক বিগত কয়েক দশকের মধ্যে তলানীতে ঠেকেছে । অপরদিকে রুশ – চীন সম্পর্ক এখন হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থান করছে । চীন ও রাশিয়ার উল্থান ঠেকাতে গত চার দশক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও নীতি নির্ধারকরা এমন কোন প্রচেষ্টা অবশিষ্ট রাখেনি । সৌভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন এবং সে সময় রুশ অর্থনীতির বেহাল দশা ওয়াশিংটনকে আরো আত্নপ্রত্যয়ী করে তোলে । মস্কোয় পাশ্চাত্যের অসংখ্য এনজিও ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান মূলত: গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে । চার বছর পূর্বে ভ্লামিদির পুতিন পশ্চিমা এনজিও কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেন । কমিউনিস্ট শাসিত চীনে এনজিও কার্যক্রম চালুর শত চেষ্টা তদবির করেও সফল হতে পারেনি পশ্চিমারা । উল্লেখ্য, কমিউনিস্ট শাসিত চীনে পশ্চিমা পরিচালিত এনজিও নিষিদ্ধ । সাবেক সৌভিয়েত আমলে এনজিও সংস্থাগুলো মস্কোয় কাজ করার অনুমতি লাভ করে । সন্দেহ করা হচ্ছে, রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করার নেপথ্যে এসব এনজিও জড়িত ।




চীন ও রাশিয়া দুটি দেশ । এরমধ্যে চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প সাম্রাজ্যে অগ্রসর | অন্যদিকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে রাশিয়া অগ্রসর । এদু’টি দেশ আবার ওয়াশিংটন ও তার ঘনিষ্ট মিত্রদের জন্য হুমকিস্বরুপ বলে বিবেচনা করা হয় । গত এক দশক চীন ও রাশিয়া ওয়াশিংটন তথা পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে অবস্থান গ্রহন লক্ষনীয় । চীনা পন্য সারাবিশ্ব ছেঁয়ে গেছে । রুশ সমরাস্ত্রের বাজার ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে । এতে করে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ব্যবসা বানিজ্য লাটে উঠার উপক্রম হয়েছে । ইতিমধ্যে পাশ্চাত্যের শত শত কল কারখানা দেউলিয়া ঘোষনা করা হয়েছে । ফলে স্বাভাবিকভাবে বেজিং ও মস্কোকে টার্গেট করেছে পশ্চিমারা । এখন পাশ্চাত্যের শত্রু হিসেবে পুতিন ও শি জিনপিংকে বিবেচনা করা হলেও নিজ দেশে দুই ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের পূণ:উল্থানে শঙ্কিত প্রতিপক্ষ । গত পাঁচ বছর পররাষ্ট্রনীতিতে পুতিন ও শি জিনপিং বিচক্ষনতা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে – পশ্চিমারা বহুক্ষেত্রে নিস্ফল ।




মি. পুতিন ও মি. শি জিনপিং এর উদ্দেশ্য আপাতত অভিন্ন । রাশিয়া ও চীনকে সর্বক্ষেত্রে শক্তিধর করা এবং ওয়াশিংটনের ও তার মিত্রদের কর্তৃত্ব খর্ব করাই মূল উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে । আবার দুই মিত্র একে অপরকে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করছে । উদাহরণস্বরুপ, চার বছর পূর্বে রুশ অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিলে পুতিনের বিশেষ আমন্ত্রণে সে দেশ সফর করেন শি জিনপিং । সফরকালে উভয় দেশের মধ্যে ১৮টি চুক্তি সম্পাদিত হয় । এরমধ্যে রাশিয়ার ৮টি প্রকল্পে চীন সরাসরি ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ এছাড়া আরো তিনটি বিশেষ প্রকল্পে সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে । চুক্তির মাত্র তিন মাসের মাথায় রুশ অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হয় । তেমনিভাবে রাশিয়া চীনকে এস-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্রসহ বেশ কিছু অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র প্রদান করেছে । এক কথায় বর্তমান রুশ – চীন সম্পর্ক মূদ্রার এপিঠ ওপিঠ বলা চলে । মার্কিন সমরবিদ ও অর্থনীতি বিশারদদের মতে, রাশিয়া ও চীন যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে এগুচ্ছে, তাতে করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন তথা পশ্চিমাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে ।

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক




Facebook Comments