চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং : পরাক্রমশালী স্থান অর্জনে প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ

China, President




আনোয়ারুল হক আনোয়ার : বিশ্বে পরাক্রমশালী স্থান পাকাপোক্ত করতে চীন যা যা করার তা-ই করবে । চীনা প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং তার বক্তব্যে সেটা পরিস্কার করেন । মঙ্গলবার বেজিং এ চীনা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (এনপিসি)র বার্ষিক অধিবেশনের সমাপ্তিতে তিনি বলেন, সমৃদ্ধি নিয়ে আত্নতুষ্ঠিতে ভোগার সূযোগ নেই, রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত রয়েছে চীন । তিনি বলেন, ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়ানো চীনকে সমাজতন্ত্রই রক্ষা করতে পারে । তাইওয়ান ইস্যুতে ইঙ্গিত করে মি. শি বলেন, চীনকে বিভাজনের প্রচেষ্টাকারীদের পরিণাম ভালো হবেনা । বিশ্বে নিজেদের পরাক্রমশালী স্থান পাকাপোক্ত করতে শত্রুদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী লড়াই চালাতে প্রস্তুত চীন । মাত্র তিনদিন পূর্বে আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শথপ গ্রহনের পর মি. শি জিনপিং ভবিষ্যত কর্মপন্থা নিয়ে তার মহা পরিকল্পনা ঘোষনা করেন । প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্বে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহনের পরোক্ষ হুমকি রয়েছে তার বক্তব্যে । মি. শি’র বক্তব্য বেশ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে বিভিন্ন দেশ ।




চীনা প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং এর বিগত সময় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তিনি চীনকে শক্তিশালী অবস্থানে উন্নীত করেন । শত্রুর প্রতি হুংকারের পাশাপাশি নিজের সমর প্রস্তুতি বৃদ্ধি করছে । পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি চীনের অবস্থান মজবুত করেন । জিবুতিতে চীনা সামরিক ঘাঁটি, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় নৌ-বন্দর স্থাপন, দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে চীনা সামরিক উপস্থিতি শত্রু পক্ষের হৃদকম্পন বৃদ্বি করেছে । ইউরোপের বিশাল বাজার এখন চীনের দখলে । ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা পণ্যে শুল্কারোপ বৃদ্বির কথা বললেও বাস্তবে বেজিং-ওয়াশিংটনের বানিজ্য ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্বি পাচ্ছে । এশিয়ার ৭৫% শতাংশ বাজার এখন চীনের দখলে । সে ক্ষেত্রে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানী কিংবা ওয়াশিংটন এর ধরেকাছেও নেই । শি জিনপিং প্রণীত “ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” প্রকল্প ধীরে ধীরে এগুচ্ছে । ভারত এর বিরোধিতা করলেও এক সময় নরেন্দ্র মোদী সরকার শীতল মনোভাব প্রদর্শন করবে বলে প্রতীয়মান হয় । ভারত তিব্বতকে নিজেদের ভূমি দাবী করলেও প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক সময় চীন সফরে গিয়ে “তিব্বত চীনের অংশ” বলে স্বীকৃতি দেন ।




মি. শি জিনপিং’কে আত্নবিশ্বাসী, মেধাসম্পন্ন ও কঠোর শাসক বলা হয় । বন্ধুদেশের প্রতি যেমন উদার তেমনিভাবে শত্রুদেশের প্রতি কঠোর মনোভাবাপন্ন মি. শি যে কোন চ্যালেঞ্জ গ্রহনে প্রস্তুত । দক্ষিণ চীন সাগরের মালিকানা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নৌ-উপস্থিতির বিপরীতে বেজিং সেখানে সমরশক্তি দ্বিগুন বৃদ্ধি করেছে । এর সুবাদে পূরো দ্বীপ ও বিশাল সমূদ্র এখন চীনের দখলে । শি জিনপিং কখনো প্রতিপক্ষকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি । শি জিনপিং এর শাসনামলে সারাবিশ্বে চীনের বন্ধুদেশ সংখ্যা বৃদ্বি পেয়েছে । এক সময় পাকিস্তান ছিল চীনের একমাত্র বন্ধু । ২০১৭ সালে মি. শি জিনপিং পাকিস্তান সফরে গেলে সেখানে পাক পার্লামেন্ট ও সিনেট যৌথ অধিবেশনে তিনি বিষয়টি পূণ:রোল্লেখ করেন । বৃটেন, রাশিয়া, ইরান, মিশর, তুরস্ক, সৌদী আরব, কাতার, আমিরাত, আলজেরিয়া, তিউনেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে চীনের উষ্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় । অপরদিকে পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া হচ্ছে বন্ধুত্বের প্রথম কাতারে । রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং হচ্ছে সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু । গত কয়েক বছর ওয়াশিংটনের বিপরীতে এই দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক অনেক অসাধ্য কাজ সাধন করেন ।




চীনা প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং তার অভীষ্ট লক্ষে ধীরস্থিরভাবে এগুচ্ছেন । প্রতিযোগীতা মূলক বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন কোন একটি দেশের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ । সে লক্ষে মি. শি জিনপিং তার মহা পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করবেন । এ মুহুর্তে চীনের দুই প্রতিদ্বন্ধী আমেরিকা ও ভারত সক্রিয় রয়েছে । মি. শি জিনপিং ওয়াশিংটনের বিপরীতে ইউরোপীয় বাজার দখলে নিয়েছে । শুধু তাই নয় – ইউরোপে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে । সেখানে চীন একটি শক্তিশালি অবস্থানে রয়েছে । উপরোন্ত আমেরিকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মালিক চীন । এছাড়া আবাসনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীন বিপূল অর্থ বিনিয়োগ করেছে । ভারতকে কাবু করতে চীন সম্ভবত দুইটি অপশন নিয়ে এগুচ্ছে । প্রথমত : “ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” এ ভারতকে অর্ন্তভুক্ত করা । দ্বিতীয়ত : ভারতকে চারিদিকে ঘিরে ফেলা । শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, নেপাল, মিয়ানমার ও পাকিস্তানে আসন পেতে বসেছে চীন । এখন শুধু ভূটানকে ম্যানেজ করতে পারলে ভারত মাকসড়ার জালের ন্যায় আটকে যাবে । অর্থাৎ দুই শত্রু দেশকে দু’ভাবে ঘিরে ফেলছে মি. শি জিনপিং । পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চীনকে আর মাত্র এক দশক অপেক্ষা করতে হবে । চীনের আজীবন প্রেসিডেন্ট মি জিনপিং এর সূযোগ্য নেতৃত্বে চীন হয়ত আগামীতে তার অভীষ্ট লক্ষে পৌছবে ।

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক




Facebook Comments