নোয়াখালী বিভাগ গঠনের যৌক্তিকতা।

নিজাম উদ্দিন: নোয়াখালী ভাষাভাষী অঞ্চল বা বৃহত্তর নোয়াখালী তথা ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষীপুর এর লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রানের দাবী নোয়াখালী বিভাগ। বিভাগের এই দাবী অাজ বা গত কয়েকবছরের দাবী নয়। এটা নোয়াখালীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবী। তৎকালীন মুশফিক কমিটি নোয়াখালীকে বিভাগ করার জন্য সর্বপ্রথম দাবী জানায়। তারপর থেকেই শুরু হয় নোয়াখালীকে বিভাগ করার অান্দোলন। নোয়াখালীবাসী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে প্রানের এ দাবীটি জানিয়ে অাসছে, সেটা অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, গনমাধ্যমে, এমনকি রাজপথে। লক্ষ লক্ষ মানুষ শুধু নোয়াখালীর রাজপথেই নয় ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নোয়াখালীকে বিভাগের দাবীতে রাজপথে নেমেছে নোয়াখালীবাসী।



নোয়াখালী বিভাগ শুধু অামাদের অাবেগ থেকেই বলছিনা, বা প্রশাসনে নোয়াখালীর লোকের অাধিক্য বলেই বলছিনা। সবদিক থেকে সব যুক্তিতে তাকালেও বলা চলে বাংলাদেশে অার কোন বিভাগ হলে সেটার দাবিদার একমাত্র ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী জেলা।
কিন্তু কেন নোয়াখালীই বিভাগ হওয়ার যোগ্য ? তাই অাগে অামরা জেনে নেই দেশে কেন একটি নতুন বিভাগ গঠন করা হয়।  বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। তার ধারাবাহিতায় রাজধানীর বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারের উন্নয়নকর্ম ও সেবা পৌঁছে দিতে দেশে নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্যই এই সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিভাগ গঠনের উদ্যেশ্য হল সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া শুধু  রাজধানীকেন্দ্রীক নয়, সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া একং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামোসহ সর্বোপরি উন্নয়ন করা।
বিগত দিনে বাংলাদেশে নতুন বিভাগ গঠনের প্রক্রিয়া দেখেছি অামরা। খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ কে বিভাগ করা হয়েছিল ভৌগলিক অবস্থান ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারের সেবার মান উন্নয়নের লক্ষে। যেমন যশোর ছিল খুলনার চেয়েও প্রাচীন জেলা এবং অবকাঠামোগত দিক থেকে যশোর খুলনার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু যশোরকে বিভাগ করলে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলো অবহেলিতই রয়ে যেত তাই সরকার খুলনাকেই বিভাগ গঠন করে। তেমনি রংপুরের চেয়ে বগুড়া অবকাঠামোগত দিক থেকে এগিয়ে থেকেও বিভাগ হয়েছে রংপুর। কারন বগুড়াকে বিভাগ গঠন করলে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম সহ বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলাগুলো অাগের মতই অবহেলিত থাকত। তাই অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক দিক চিন্তা করে রংপুরকেই বিভাগ গঠন করা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গঠিত হয়েছিল দেশের সর্বশেষ ময়মনসিংহ বিভাগ। শুধু অবকাঠামোগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেই বিভাগ গঠন করা যায়না, বিভাগ গঠনের উদ্দেশ্য যাতে সফল হয় সেরকম জেলাকেই বিভাগ করতে হবে।
সম্প্রতি সরকার নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চল নিয়ে নতুন অারেকটি বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়, এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে ময়নামতি বিভাগ নামে কুমিল্লাকে বিভাগের জন্য মনোনীত করে। কিন্তু  রাজধানী থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দুরুত্বের কুমিল্লা বিভাগ হলে কিভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়ন হবে ? বরং বিভাগ গঠনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ অাগের মতই সুবিধাবঞ্চিত হয়ে থাকবে। অন্যদিকে ঢাকা থেকে কুমিল্লার চেয়ে তিনগুণ বেশি দুরুত্বের ১৬০ কিলোমিটার দূরে নোয়াখালীকে বিভাগ গঠন করা হলে উপকুলীয় অবহেলিত অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। এতে বিভাগ গঠনের উদ্যেশ্যও সফল হবে।
এছাড়াও অাপনারা জানেন যে নোয়াখালীর অধীনে বঙ্গোপসাগরে নিয়মিতই জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ ভুখন্ড বা চর। নিয়মিত জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে যা একসময় বিশাল জনপদে পরিনত হবে এবং যার পরিমান বর্তমান নোয়াখালীর সমান বা বেশী হবে। এ কারনেও কুমিল্লা না হয়ে সেসব চরাঞ্চলের কাছাকাছি নোয়াখালী তে বিভাগ হলে অদুর ভবিষ্যতে সেসব এলাকার উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অার অায়তনের দিক থেকেও নোয়াখালীই বিভাগের দাবীদার। ইতিহাস বলে নোয়াখালী জেলা প্রতিষ্টিত হয় ১৮২১ সালে অন্যদিকে কুমিল্লা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। অায়তনের দিক থেকেও কুমিল্লার চেয়ে নোয়াখালীর অায়তন বড়। নোয়াখালীর অায়তন ৪২০২ বর্গকিমি. যা ক্রমাগত বাড়ছে প্রতিনিয়ত অন্যদিকে কুমিল্লার অায়তন ৩০৮৭.৩৩ বর্গকিলোমিটার।
সংস্কৃতির কথা বললে নোয়াখালীর ভাষা সংস্কৃতি কুমিল্লার চেয়ে বহুগুনে বিস্তৃত। বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগের মত নোয়াখালীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি। নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষীপুর এ তিন জেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী চট্টগ্রামের কিছু অংশ, স্বন্দীপ, মনপুরা এবং কুমিল্লারই বেশ কিছু অংশ নোয়াখালীর সংস্কৃতিতে চলে অাসছে হাজার বছর ধরে। তাই বলা চলে বিভাগ হওয়ার যোগ্য দাবীদার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালীই।
ভৌগলিক কৌশলগত কারনেও কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে অাপত্তি থাকে, তা হল কুমিল্লা থেকে ৫ কি.মি. পূর্বেই ভারতের সোনামুড়া বাজার। সেক্ষেত্রে নোয়াখালীই সর্বোত্তম।
নোয়াখালীর রয়েছে সমুদ্র এলাকা। এখানে অাধুনিক সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠা করার রয়েছে দারুন সুযোগ যা পাল্টে দিবে দেশের অর্থনীতি। সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অাজ পৃথিবীর বিভিন্ন ছোট রাষ্ট্রগুলো উন্নত রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে। তাই সামুদ্রিক সুবিধাদির কথা বিবেচনা করে নোয়াখালীকেই বিভাগ ঘোষনা করা অতীব জরুরী।
দেশের প্রতি নোয়াখালীর রয়েছে অনেক অবদান। বাংলার সূচনালগ্ন থেকেই এ দেশকে নোয়াখালী দিয়ে গেছে অনেক কীর্তিমমান কিছু সন্তান, যারা বাংলাকে করেছে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের শিল্প বাণিজ্যকে সমৃদ্ধ করেছে নোয়াখালীর সন্তানেরাই। তারাই চাঙ্গা করেছে দেশের অর্থনীতি। যে বৈদেশিক রেমিট্যান্স দিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈততিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে সে প্রবাসীদের সিংহভাগই নোয়াখালীর সন্তানেরা। দেশের শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে নোয়াখালীর সন্তানদের বিস্ময়কর বিচরণ ছিল, অাছে এবং থাকবে। এতকিছুর বিনিময়ে সেই নোয়াখালী দেশের কাছে একটি যৌক্তিক দাবী নোয়াখালী বিভাগ অাশা করতে পারেনা?
তাই বিগত দিনে বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগগুলো যেভাবে গঠিত হয়েছে সেভাবে বলা যায় নোয়াখালী ই বিভাগের যোগ্য দাবীদার। কুমিল্লা অবকাঠামোগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগের ন্যায় বিভাগ গঠনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী এবং সরকারের উন্নয়নকর্ম দেশের প্রান্তিক ও অবহেলিত অঞ্চলে পৌছে দিতে নোয়াখালীই বিভাগ গঠনের যোগ্য দাবীদার।
নিজাম উদ্দিন
সাংবাদিক ও বিভাগ বাস্তবায়ন অান্দোলন নেতা।
Facebook Comments