বাংলাদেশ

অগ্নি নির্বাপনী ধারনা ও সচেতনতামূলক মহড়া জরুরী।

ঢাকার বাতাসে চকবাজারের ছুরিহাট্টায় সারি সারি পোড়া লাশের গন্ধ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই অারো একটি ট্র্যাজেডি। ২৮শে মার্চ বনানী এফ.অার টাওয়ারে ঘটে দেশের ইতিহাসের অারো একটি হৃদয়বিদারক অগ্নি দুর্ঘটনা। সেদিন বাঁচার জন্য ভবনের ভেতরের মানুষদের অাহাজারি অার অাকুতি পুরো জাতিকেই নাড়া দিয়েছিল। অাগুনের বিভৎসতায় অাকাশচুম্বী ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ার এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য যেন সিনেমাকেও হার মানিয়েছিল সেদিন। ভবনের ভেতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঝরে গেছে অারো কত প্রাণ।

এফ. অার টাওয়ারে সেদিন ৮ম তলার একটি বায়িং হাউজ থেকেই অাগুনের উৎপত্তি ধারনা করা হয়। ঐ ভবনে অগ্নি নির্বাপনী ব্যাবস্থা পর্যাপ্ত না থাকলেও যে একেবারেই ছিলনা বিষয়টি এমনও নয়। এফ. অার টাওয়ারে ফায়ার এলার্ম ছিল, ছিল অগ্নি নির্বাপনী সিলিন্ডারসহ অগ্নি নির্বাপনী কিছু  সরঞ্জামাদি ও জরুরী বহির্গমন পথ। কিন্তু কেন দুর্ঘটনাটি এত ভয়াবহ রুপ নিল ? শুধুমাত্র অগ্নি নির্বাপনী ধারনা ও সচেতনতার অভাবে যন্ত্রগুলোর সঠিক সময়ের ব্যাবহার না করাতেই ঘটে যায় এই বড় দুর্ঘটনা। কোনটিরই সেদিন সঠিক ব্যাবহার হয়নি, অর্থাৎ করতে পারেনি। ভবনে থাকা সকলের কারোরই হয়ত অগ্নি নির্বাপনী যন্ত্রগুলোর পরিচালনার সামর্থ্য বা ধারনা ছিলনা বা অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদিগুলো অকার্যকর ছিল।

এফ.অার টাওয়ারের অগ্নিকান্ড পরবর্তী একটি গনশুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ছিল যে এফ.অার টাওয়ারে সেদিন ফায়ার এলার্ম বাজেনি। অাগুন লাগার পর অনেকেই বুঝতে পারেনি যে ভবনে অাগুন লেগেছে। কয়েকজন ঘটনাটি অনুধাবন করলে তারা বিচ্ছিন্নভাবে ছাদে, নিচে, কিংবা পাশের ভবনের ছাদে গিয়ে ভবনে থাকা অন্যদের অগ্নিকান্ডের খবর ফোন করে জানায়। ততক্ষণে জরুরী বহির্গমন পথ ধোঁয়ায় অাচ্ছন্ন হয়ে যায় অার সিড়ি তে জটলা বেধে যাওয়ার কারনে নামতে পারেনি অনেকেই। ফলশ্রুতিতে অাগুনের কাছে হার মেনে মৃত্যুপথে পতিত হয়েছিল অনেকেই।

অথচ ভবনটিতে সেদিন ফায়ার এলার্ম বাজলে বা ভবনের অগ্নি নির্বাপনী সরঞ্জামাদি সক্রিয় থাকলে এবং ভবনে থাকা মানুষদের অগ্নি নির্বাপনী ধারনা বা সচেতনতা থাকলে হয়ত ঘটনাটি এমনভাবে দুর্ঘটনা না ও হতে পারত।  এফ অার টাওয়ারে এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করার অাসলেই অসম্ভব ছিল, কেননা এখানে অগ্নি নির্বাপনী কিছু ব্যাবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা কখনও পরখ করা হয়নি। এই ভবনটিতে কখনও অগ্নি সচেতনতা মহড়া হয়নি। যার করনে পর্যাপ্ত ধারনা ও সচেতনতার অভাবে ভবনে থাকা মানুষরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেনি।

তাই প্রতিটি ভবনে অগ্নিনির্বাপনী সচেতনতা মহড়া করাটা খুবই জরুরী। এতে ভবনে থাকা মানুষদের মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনায় করনীয় সম্পর্কে বাস্তবিক ধারনা পাবে, যা দুর্ঘটনার সময় মোকাবিলা করার সামর্থ্য যোগাবে। প্রত্যেক অাবাসিক বা বানিজ্যিক ভবনে থাকা সবাইকে ফায়ার ফাইটিং প্রশিক্ষণ ও অগ্নি নির্বাপনী সরঞ্জামাদি ও এর ব্যাবহার সম্পর্কে ধারনা দিতে হবে, এতে অগ্নি দুর্ঘটনার সময় করনীয় ও শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। প্রশিক্ষণ পরবর্তী ভবনের প্রতি তলাভিত্তিক অগ্নি নির্বাপনী টীম গঠন করে দিতে হবে।  বানিজ্যিক ভবন বা কারখানা গুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপনী সরঞ্জামাদি যেমন ফায়ার এক্সটিংগিশার, ফায়ার হাইড্রেন্ট পাম্প, ফায়ার হোস মজুদ রাখতে হবে এবং নিয়মানুযায়ী এসব সরঞ্জামাদির মেয়াদকাল পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এবং ভবনের জরুরী নির্গমন পথ সবসময় খোলা ও সচল রাখতে হবে।

এছাড়াও ঢাকা শহরের সড়কের প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় শহরে অারো ফায়ার স্টেশন বৃদ্ধি করতে হবে। এবং ফায়ার সার্ভিসকে অারো অাধুনিক করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জামাদি দিয়ে ১৪-১৫ তলা পর্যন্ত ভবনের অাগুন নেভাতে কাজ করা যায়। কিন্তু এর অধিক তলা বিশিষ্ট ভবনের অাগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের অাধুনিক লেডারযক্ত (মই) গাড়ি রয়েছে, যার জন্য ২৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তার প্রয়োজন। তাই সড়কের প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে হবে। শহরের অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে রাজউককে অারো কঠোর হতে হবে। রাজউকের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি বানিজ্যিক ও অাবাসিক ভবনের জন্য পৃথক তিনটি সিঁড়ি থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাম্তবে তা অনেকাংশেই মানা হচ্ছেনা। এছাড়াও বানিজ্যিক ভবনের জন্য কমপক্ষে এক লক্ষ লিটার ধারনক্ষমতার ট্যাংক ও পানি মজুদ রাখতে হবে, কিন্তু সেটাও মানা হচ্ছেনা সব জায়গায়। এসব সমস্যার সমাধানে রাজউক ও ফায়ার সার্ভিসকে এক হয়ে কাজ করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

দেশে বাড়তে থাকা অগ্নি দুর্ঘটনা নিয়ে এখনই মাথা ঘামাতে হবে। তা না হলে তাজরীন গার্মেন্টস ট্রাজেডি , নীমতলী ট্রাজেডি, চকবাজার ট্রাজেডি কিংবা বনানী এফ.অার টাওয়ার ট্রাজেডির মত ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে হবে দেশবাসীকে। অাজ অপনার অাত্মীয়-অনাত্মীয়রা অাগুনে ঝলসে যাচ্ছে, কাল অাপনি অামি যে এই অবস্থার মুখোমুখি হব না সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই সরকার-জনগন ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অারো কঠোর ও সচেতন হতে হবে।

লেখকঃ
নিজাম উদ্দিন
ডিপ্লোমা চিকিৎসক
drnizamuddin7@gmail.com

Facebook Comments

Related Posts